Buy this theme? Call now 01710441771
Welcome To Abc24.GA
.Nov 20, 2016

একজন বেকারের আত্মকাহিনী



“আদনান ওঠ এইবার! আর কত ঘুমাবি? তোর
অফিস নাই দেখে সকাল ১০ টা পর্যন্ত
ঘুমাবি এইটা কোনো কথা হইল?”
প্রতিদিন আমার ভাবীর এই মধুমাখা
বাণী শুনেই আমার ঘুম ভাঙ্গে। ভাবী
যেন আমার জীবন্ত এলার্ম ঘড়ি। আমার
মতো প্রত্যেক বেকার যুবককেউ সম্ভবত
এমন মধু মাখা বাণী শুনেই সকালে ঘুম
থেকে উঠতে হয়। ঘুম ভাঙ্গার পর
বাথরুমে যাই। টুথপেস্টে প্রায় ১০
মিনিট টেপাটেপি করার পর ভেতরের
কিছু আণুবীক্ষণিক পেস্ট বের হয়ে
আসে। ওটা দিয়েই কাজ চালাই।
কোনদিন যে পেস্ট বের করতে গিয়ে
আমার আঙ্গুলের হাড্ডি ভাঙ্গে কে
জানে ! পত্রিকায় শেষের পৃষ্ঠায় খবরও
আসতে পারে “ টুথপেস্টের জন্য ভাংল
হাড্ডি” হাড্ডি কেনই বা ভাংবে
না? একটি মাঝারি আকৃতির পেস্ট
কতদিন সাধারণত চলে? সর্বোচ্চ দেড়
মাস। সেই জায়গায় আমি প্রায় ৫ মাস
যাবত এই পেস্ট ব্যবহার করে আসছি। ভাই
ভাবীর কাছে পেস্ট চাই না। চাইলেই
সেই একি ক্যাসেট আবার বাজতে শুরু
করবে। ভাবীর ক্যাসেট থেকে আসবে
কর্কশ, হতাশা মেশানো কণ্ঠ “ আদনান
আর কত? সেইদিন তোমারে পেস্ট
দিলাম, আর আজকেই শেষ? আমি তো
তোমার জন্য পেস্টের দোকান দিয়া
বইসা নাই!জিনিস পত্রের দাম কত
বারসে জান কিসু? একটা চাকরি
বাকড়ির খোঁজ করনা কেন? সবাই
চাকরি পায় তুমি খালি পাওনা! আর
কত ভাইএর উপর বইসা বইসা খাবা?
ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাই এর ক্যাসেটে
থাকবে গাম্ভীর্য মেশানো হতাশা “
আদনান ইয়ং ম্যান, আর তো এভাবে
হচ্ছে না। ভাইএর হোটেলে আর কতদিন?
শো মি সাম ফায়ার ইয়ং ম্যান!” হাত মুখ
ধুয়ে বের হয়ে আসি। টেবিলে আমার
জন্য যথারীতী এক পিস আঠালো চটচটে
রুটি রাখা আর সাথে কিছু পেপে
ভাজি। তাই কোনোমতে গিলে উঠে
পরি। বেকারদের সবই খাওয়ার অভ্যাস
করতে হয়। আরেক পিস রুটি খাওয়ার
ইচ্ছা থাকলেও চাইনা। কি দরকার
ভাবীর গলা কে কষ্ট দেওয়ার? একী !
আমার পরিচয় টাই যে এখনও দেওয়া
হয়নি। আমি একজন টগবগে প্রাণবন্ত
উদ্দাম ইত্যাদি বিশেষণ যুক্ত “বেকার
যুবক” নাম মোঃ আদনান আহমেদ।
মাস্টার্স পরিক্ষায় সেকেণ্ড ক্লাস
পেয়ে অত্যন্ত আনন্দের সাথেই পাশ
করেছিলাম। আপনারা হয়ত ভাবতে
পারেন এই ছেলে পরিচয় দেওয়ার সময়
সবার আগে সে যে বেকার তা বলে
কেন? সমস্যা কি এই ছেলের? আসলে
পাশ করার তিন বছরর পরেও কোনো
চাকরি না পাওয়ায় এবং “বেকার”
শব্দটির পুনঃ পুনঃ আক্রমণে এখন মনে হয়
আমি বেকার এটাই সমাজের কাছে
আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাসা
থেকে বের হয়ে এলাম। পকেট হাঁতরে
কাগজের টুকরাটা বের করলাম। চাকরির
জন্য ইন্টারভিউ নেওয়া হবে এক
বেসরকারি ফার্মে। তারই ইন্টারভিউ
দেওার জন্য কাগজ। জানি যেয়ে
কোনো লাভ হবে না। গত তিন বছর ধরেই
আমি পরম যত্নের সাথে ইন্টারভিউ
দিয়ে আসছি। বাংলাদেশে মামা
খালু চাচা ছাড়া চাকরি পাওয়া
আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার চেয়েও
আশ্চর্জজনক। ব্যাবসা বাণিজ্যের দিকে
যাওয়ার চেষ্টা যে করিনি তা নয়।
তবে বাংলাদেশে ফ্রীতে কোনো
ব্যাবসা করা যায়না। ক্যাপিটেল
লাগে। কে দিবে আমাকে
ক্যাপিটেল? আমার ভাই? হা হা হা!
যিনি মনে করেন আমি একটা থার্ড
ক্লাস লোফার টাইপ ছেলে তার নিশ্চই
আমাকে আর যাই হোক কোনো টাকা
দেওয়ার কথা না! এসব কথা ভাবতে
ভাবতে এন,জি,ও টার সামনে এসে
পরলাম। আমার মত আরো শ’খানেক যুবক
দাঁড়িয়ে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেললাম। পোস্ট একটা। এর জন্য
শ’খানেক ছেলে লাইন ধরে আছে।
সবাই এসেছে একটা চাকরির জন্য। এর
মধ্যে অর্ধেকের বেশি লোকেরই মামা
চাচা আছে। কারো পেছনে আবার
আছে মন্ত্রীর সুপারিশ। এদের মধ্যে
থেকেই কারো চাকরি হবে। বাকিরা
আমার মত ফিরে যাবে।নতুন কোনো
চাকরির খোজ করবে। ঘণ্টা দু’এক পর বের
হয়ে এলাম। সবই আগের মত। প্রথম প্রথম
ইন্টারভিউ দিয়ে আসার পর খুব
উত্তেজনা অনুভব করতাম। চাকরি
পাওয়ার যে সম্ভাবনা তার
উত্তেজনা। এখন আর সেরকম কিছু মনে
হয়না। আমি জানি চাকরি হবে না,
যারা ইন্টারভিউ নিয়েছেন তারাও
জানেন চাকরি হবে না। হাঁটতে
হাঁটতে পার্কের সেই বেঞ্চটাতে
গিয়ে বসলাম। এই জায়গাটা আমার খুব
প্রিয়। এখানেই তার সাথে আমার প্রথম
দেখা হয়েছিল। পাঁচ বছর ছিলাম আমরা
এক সাথে। গত বছর তার বিয়ে হয়ে যায়।
কোনো বাবাই তার মেয়েকে কোনো
বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবে
না। তাই বাধ্য হয়েও সে চলে যায়
আমাকে ছেড়ে। তার বিয়ের পর এক
সপ্তাহ পর্যন্ত আমি মানসিক ভাবে
অসুস্থ ছিলাম। উন্মাদের মত রাত
বিরাতে রাস্তায় হাঁটতাম। নিজেকে
ঠিক করতে মাস খানেকের মত সময়
লাগে। যদি মা বাবা বেঁচে থাকত
তাহলে হয়তব আমার অবস্থা আরেকটু
ভাল হত। সবসময় কচ্ছপের মত নিজেকে
খোলকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে হত
না। সেদিন বাসায় গিয়ে দেখি এক
মেয়ে বসে আছে ড্রইংরুমে। যে সুন্দর
দেখলে বুকে ব্যাথা শুরু হয় মেয়েটা
ছিল সেই রকম সুন্দরী। আমি প্রাণপনে
আশা করছিলাম যাতে আমার ভাইএর
সামনে না পরি। সামনে পড়লেই একটা
টগবগে তরুণীর সামনে উনার ক্যাসেট
প্লেয়ার বাজা শুরু করবে। আমি স্রষ্টার
কাছে মনে প্রাণে চাইলাম, “ আল্লাহ,
প্লিজ তুমি আমার ভাইকে আমার
সামনে আইনা দাও”। আমার
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমি
দেখেছি আমি স্রষ্টার কাছে যেই
জিনিসটা চাই উনি তার বিপরীত টাই
করেন। তাই এবার চাইলাম যাতে
আমার ভাইএর সাথে দেখা হয়। কিন্তু
এবার স্রষ্টা আমার কথা ঠিকমতই
রাখলেন। ঘড়ের ভেতর ধুকেই ভাইএর
সামনে পড়তে হল। ভাইএর ক্যাসেট
প্লেয়ার সাথে সাথে বাজা শুরু করল, “
এই যে আমাদের বিরাট অফিসার
সাহেব আসছেন! এই যে দেখ, আমার বন্ধুর
মেয়ে। এইবার ডি,আম,সি তে ২০ তম
হইসে।কত্ত ব্রিলিয়ান্ট চিন্তা করতে
পারস? আর তুই? না আছে পড়াশুনা না
করে কোনো চাকরি বাকড়ি! অপদার্থ”
ভাই যখন এই কথা গুলা বলতেসিল তখন
ইচ্ছা করছিল মাটিতে গর্ত করে
ভেতরে ঢুকে লুকায়ে পড়ি। থাক সেসভ
কথা। এখন আর এসব ভেবে লাভ নাই।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ক্লান্ত পায়ে
বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। -
কয়েকদিন পরের কথা। সারাদিন
বাইরে ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যার দিকে
বাসায় আসি। বাসার পর কেমন একটা
থতমত খেয়ে গেলাম। বাসার
পরিস্থিতি কেমন যেন একটু থমথমে।
নিজের রুমে ধুকে লাইট টা
জ্বালালাম। সাথে সাথে ভাইএর
তীব্র চিৎকার শুনা গেল। “ কুত্তার
বাচ্চা টা আইসে? হারামীর
বাচ্চাটা কই? ভাইয়া পাগলের মত
চিৎকার করতে করতে আমার রুমে আসল।
ভাইয়ের লুঙ্গি হাটু পর্যন্ত তুলা। সারা
গা খালি। চোখ লাল। ভাইকে দেখতে
পাগলা কুকুরের মত লাগতেসিল।
“কুত্তার বাচ্চা, আমার টাকা কই?”
হিংস্র স্বরে বলল ভাই। “কিসের
টাকা? হতবাক হয়ে যাই আমি। “এহহ
আইসে, তুমি কিছুই জাননা,না? টিভি
কেনার জন্য যে তিরিশ হাজার টাকা
রাখসিলাম অইডা কই হারামী? “ আমি
কেমনে জানব তোমার টাকা কই?” “তুই
জানস না মানে? তুই নিসস হারামী !
বল আমার টাকা কই?” “ আমি জানিনা
তুমি কোন টাকার কথা বলতেস” “ ভাল
সাজতেসস আমার সামনে, না?
বেকারের বাচ্চা বেকার, চোর, আগে
আমার মাথার উপরে বইসা খাইতি আর
ওহন চুরিও করা শুরু করসোশ? দাড়া
হারামজাদা তোর মুখ দিয়া আজকে
আমি টাকা বাইর করমু” পরবর্তী দু’ঘন্টা
আমার উপর দিয়ে কি বয়ে গেছে তা
বলার আর প্রয়োজনবোধ করছিনা। খালি
এটাই বলি আমার ভাই যখন আমাকে ঘর
থেকে লাথি মেরে বের করে দেয়
তখন আমার আর হাঁটার কোনো ক্ষমতা
ছিল না। মাটির উপরে পড়ে ছিলাম।
আমার সমস্ত মুখ রক্তের নোনতা স্বাদে
তিক্ত হয়ে গিয়েছিল। রাত প্রায় ১১
টা বাজে। দূরে ব্রিজটা দেখা
যাচ্ছে। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে
নিয়ে গেলাম ব্রিজটার দিকে। অনেক
কষ্টে ব্রিজের রেলিং ধরে
দাঁড়ালাম। আকাশের দিকে
তাকালাম। ঘন কুচকুচে কালো আকাশে
ঝিকমিক করছে হাজার হাজার
আলোকবিন্দু। নিচে তাকালাম।
নদীটা তার তীব্র বেগ নিয়ে বয়ে
চলছে। উপরের থেকে মনে হচ্ছিল
কালো কুচকুচে পানির তীব্র স্রোত আর
হাহাকার। আমার জীবনের রঙ কালো,
নিচের নদীটাও কালো। কালোর
সাথে কালোর মিশে জাওয়াই ভাল।
হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম। ১১ টা
২৩ বাজে। কজনেরই বা সৌভাগ্য হয়
নিজের মৃত্যর সময়টা জানার? রেলিং
এর উপর উঠে দাঁড়ালাম। বুক ভরে
নিশ্বাস নিলাম। সময় হয়ে এসেছে।
নিজেকে শুন্যে নিক্ষেপ করলাম...